1. প্রথম পাতা
  2. বার্তা
  3. 28 সেপ্টেম্বর 2026

পবিত্র প্রতিরক্ষা সপ্তাহ ও শহীদ সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহর শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে বিপ্লবের মহামান্য নেতার বার্তা

এটি মূল ফারসি পাঠের অনুবাদ। মূল ফারসি পাঠ

بسم‌الله الرّحمن الرّحیم
পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে।

وَ لَقَدْ اَرسَلنْا موسی بِایاتِنا اَنْ اَخرِجْ قَومَکَ مِنَ الظُّلُماتِ اِلی‌ النّورِ وَ ذَکِّرْهُم بِاَیّامِ الله
আর নিশ্চয়ই আমি মূসাকে আমার নিদর্শনাবলিসহ প্রেরণ করেছিলাম এই নির্দেশ দিয়ে যে, তোমার সম্প্রদায়কে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনো এবং তাদেরকে আল্লাহর দিনসমূহ স্মরণ করিয়ে দাও। (আল-কুরআন, সূরা ইবরাহীম ১৪:৫)

মেহের মাসের প্রথম দিনগুলো আল্লাহর দিনসমূহ (আইয়ামুল্লাহ) এবং প্রথম চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধে ইরানি জাতির আট বছরের প্রাণপণ প্রতিরক্ষার মহান ও চিরস্থায়ী ঘটনার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। সেই দিনগুলোতে ইরান ভূখণ্ডের বিস্তৃত অঙ্গনে বিপ্লবের সূর্যের উষ্ণ কিরণ জাতীয় সংহতি এবং বিপ্লবী ইসলামের মতাদর্শ ও পথের প্রতি বিশ্বস্ততার এক মনোরম অনুভূতি ছড়িয়ে দিচ্ছিল, যার প্রভাবে পুরোনো ও নব্য আধিপত্যবাদ ও উপনিবেশবাদের বরফ গলতে শুরু করেছিল। সেই দিনগুলোতে ইরানের কিছু মানুষের মনে ছিল তার বিশ-পঁচিশ বছর আগের উপনিবেশবাদীদের বিদ্বেষ এবং তেলশিল্প জাতীয়করণ ও আমেরিকান অভ্যুত্থান সংক্রান্ত ঘটনাবলির স্মৃতি। অন্য কেউ কেউ সেসব খবর শুনেছিলেন, আর তাঁদের অনেকেই এই বাস্তবতা ভালোভাবে উপলব্ধি করেছিলেন যে আমাদের দেশের বিষয়াদির ওপর বিদেশিদের আধিপত্য দেশের কী দশা করেছিল। কিন্তু তার আগের দিনগুলো ছিল অন্ধকারাচ্ছন্ন, যখন সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলোর রাষ্ট্রদূতরা দেশের শাহকে করণীয় ও বর্জনীয় নির্দেশ জানিয়ে দিত এবং তিনিও স্বেচ্ছায় বা অনিচ্ছায় সেগুলোই বাস্তবায়ন করতেন, যতক্ষণ না হযরত ইমাম খোমেনির নেতৃত্বে ইরানি জাতির মহান বিপ্লব সেই ব্যবস্থাকে উল্টে দেয়। এই বিপ্লবের ফলে সেই অন্ধকার দিনগুলো ইরান ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আলোকোজ্জ্বল দিনে পরিণত হয়। এটি সেই আধিপত্যবাদীদের কাছে অত্যন্ত অসহনীয় ছিল, যারা এই ভূখণ্ডের সম্পদের দিকে লোভাতুর দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছিল এবং বছরের পর বছর তা আত্মসাৎ করার জন্য এর জনগণের প্রতি নানা ধরনের অন্যায় আচরণ করেছিল। তাই তখন থেকে তারা বিপ্লবী জাতির উত্তাল নদীর প্রবাহকে পূর্বের দিকে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য তাদের সমস্ত চেষ্টা ও প্রয়াস নিয়োজিত করে, আর প্রথম চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধ ছিল ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বরকতময় জীবনের প্রথম দশকে তাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

গণবিরোধী বাথ পার্টির হাতে কয়েক দিনের যুদ্ধ এবং স্বল্প পরিশ্রমে বিজয় অর্জনের ভ্রান্ত ধারণা নিয়ে প্রজ্বলিত সেই যুদ্ধের আগুনের মধ্য থেকে ইসলামি ব্যবস্থা আগের চেয়েও পরিপুষ্ট ও শক্তিশালী হয়ে ফিনিক্স পাখির মতো জেগে উঠেছে, আগের চেয়ে উচ্চতর কণ্ঠস্বর ও উচ্চতর উড্ডয়ন নিয়ে; আর এটাই পরবর্তীতে শত্রুসৃষ্ট ঘটনাবলিতে এই ব্যবস্থার স্থায়ী বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়।

যে দিনগুলোতে এই জাতির শত্রু তার অনুচরদের তাদের ওপর চাপিয়ে দিয়েছিল এবং উপনিবেশবাদের এক নতুন রূপ প্রয়োগ করছিল, সেই দিনগুলো বিপ্লব এবং চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইসলাম ও জিহাদের পতাকা উত্তোলনের বরকতে গৌরবময় দিনে রূপান্তরিত হয়েছে; এর সমাপ্তির ৩৮ বছর পরও আজ তার প্রতিটি ঘটনা এবং তার জীবিত সাক্ষীদের সত্যনিষ্ঠ বর্ণনা পর্যালোচনা করলে এমন সব আদর্শ দৃষ্টিগোচর হয়, যার প্রত্যেকটি ইবাদত, সাহসিকতা, প্রতিরোধ, নৈতিকতা ও মানবতার শিক্ষাদানকারী, এবং যা আমাদের দেশের ইতিহাসের শিখরে উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো দীপ্তিমান।

যে দিনগুলোতে আধিপত্যবাদী ব্যবস্থার অনুসারীদের আগ্রাসনের শুরুতে আমাদের দেশ বহু হুমকির মোকাবিলায় আত্মরক্ষার জন্য তাগুতি শাসনব্যবস্থা থেকে শূন্য হাত উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছিল, সত্য প্রতিষ্ঠা ও আল্লাহর সাহায্যের বরকতে সেই দেশ আজ এমন দিনে পৌঁছেছে, যখন আধিপত্যবাদী আগ্রাসীরা নিজেরাই, তাদের অনুসারীরা নয়, ইসলামের যোদ্ধাদের আক্রমণের মুখে আশ্রয় খুঁজছে এবং যুদ্ধ বন্ধের জন্য কাকুতি-মিনতির হাত তুলছে।

যে দিনগুলোতে তারা আমাদের দেশকে ফিরিয়ে নিতে চায়, তা ছিল পশ্চাৎপদতা, লাঞ্ছনা ও অপমান, পরনির্ভরশীলতা এবং মুসলিম বিশ্বে ইরানের দুর্নামে পরিপূর্ণ দিন; আর এখন আমরা যে দিনগুলোতে আছি, তা অগ্রগতি, মর্যাদা, স্বাধীনতা এবং মুসলিম বিশ্বে, বরং সমগ্র বিশ্বে, সর্বোচ্চ সম্মানে পরিপূর্ণ। আজ কেউ কেউ আমাদের বিশ্বের চতুর্থ পরাশক্তি মনে করে। অবশ্য তারা পার্থিব হিসাবের ভিত্তিতে এ কথা বলে; কিন্তু ঐশী হিসাব সেই দেশকে বিশ্বের প্রথম শক্তি গণ্য করে, যে দেশ নিজেকে পবিত্র আহলে বাইতের (আল্লাহর দরুদ ও সালাম তাঁদের সকলের ওপর) অনুসারী মনে করে, যার অধিকাংশ মানুষ সেই মহান মর্যাদাসম্পন্নদের প্রতি অনুরক্ত এবং সত্য প্রতিষ্ঠায় যারা ভীত নয়।

সেই দিনগুলোতে ইরানের দক্ষিণের দুই সাগর ছিল শত্রুবাহিনীর বিচরণক্ষেত্র, কিন্তু এই দিনগুলোতে সাহসী যোদ্ধা ও হরমুজ প্রণালীর রক্ষীদের কাছ থেকে যে বেদনাদায়ক আঘাত তারা পেয়েছে, তার কারণে তারা আরব সাগরের চেয়ে আর এগিয়ে আসে না, এবং যখনই তারা এই ঝুঁকি নিয়েছে, নিজেদেরই ক্ষতি করেছে; আর অচিরেই আরব সাগরও তাদের থেকে নিজেকে মুক্ত করবে।

এমন দিন ছিল, যখন আধিপত্যবাদীরা মনস্তাত্ত্বিক অভিযান ও ত্রাসের পরিবেশ সৃষ্টির মাধ্যমে রাজধানীর রাস্তাগুলো জনশূন্য করে এই জাতির স্বাধীনতাকামিতার বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান ঘটিয়েছিল এবং এরপর ২৫ বছর ধরে এই দেশের সম্পদ লুণ্ঠন করেছিল; কিন্তু এই দিনগুলোতে সাত মাস ধরে আমাদের দেশবাসী সারা দেশের চত্বর ও রাস্তাগুলোকে তাদের দায়িত্বশীল ও উদ্দীপ্ত উপস্থিতিতে সুশোভিত করে রেখেছে, যাতে ইসলামের যোদ্ধাদের হৃদয় উষ্ণ থাকে এবং শত্রু আতঙ্কে নিমজ্জিত হয়। একইভাবে ৩ কোটিরও বেশি ইরানি নিজেদের জীবন উৎসর্গের প্রস্তুতি ঘোষণা করেছেন, এবং যখন একধরনের সংগঠনের জন্য তাঁদের উপস্থিতির পুনঃঘোষণার প্রয়োজন হয়, তখন প্রথম ১০০ মিনিটের মধ্যেই পাঁচ লক্ষাধিক মানুষ চাহিত সংখ্যা পূরণ করে ফেলেন। এখন বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর ইরানিদের উপস্থিতিতে সুশোভিত সমগ্র ইসলামি ইরানে নানা ধরনের প্রস্তুতি, বিশেষ করে সশস্ত্র প্রস্তুতির ঘোষণা রয়েছে, যাতে এমন এক রণাঙ্গন গড়ে ওঠে যা তাঁদের জন্য সুনাম এবং তাঁদের শত্রুর জন্য লজ্জা বয়ে আনে।

এমন দিন ছিল, যখন এই ভূখণ্ডের মানুষের সাহসিকতার বৈশিষ্ট্য কেবল এর পুরুষদের দ্বারা পরিচিত হতো; কিন্তু এখন আমরা এমন দিনে আছি, যখন সাহসী উপস্থিতির কিছু ক্ষেত্রে নারীরা পুরুষদের ছাড়িয়ে যাচ্ছেন।

এমন দিন ছিল, যখন শত্রু ব্যবস্থার সামাজিক ভিত্তিকে ক্রমাগত দুর্বল করার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু এই দিনগুলোতে সুস্পষ্ট ভিন্নতা সত্ত্বেও সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি তাদের ন্যায্য অবস্থান রক্ষায়, যার মধ্যে রয়েছে কল্যাণ ও বরকতময় হরমুজ প্রণালী রক্ষা, দৃঢ়ভাবে অবিচল রয়েছে।

অতীতের দিন ও বর্তমানের দিনগুলোর এই তুলনা আরও বিস্তৃত ও ব্যাখ্যা করা যায়, তবে এক কথায়, ইরানের প্রিয় জনগণের সেবক হিসেবে আমি ঘোষণা করছি যে, আমাদের শত্রু যে অতীত দিনগুলোতে ফিরে যাওয়ার স্বপ্ন দেখে, তা অতীত হয়ে গেছে এবং আর কখনো পুনরাবৃত্তি হবে না। অবশ্য বেদনা ও দুঃখের সঙ্গে স্মরণ করতে হয় যে, এই দিনগুলোতে মহান খোমেনি এবং মহান মর্যাদাসম্পন্ন শহীদ খামেনির (আল্লাহ তাঁদের উভয়ের মহিমান্বিত মর্যাদা সমুন্নত করুন) অভাব গভীরভাবে অনুভূত হচ্ছে, দেশের আজকের মর্যাদা যাঁদের নেতৃত্বের কাছে ঋণী। কিন্তু তাঁদের অনুসারীদের জন্য তাঁদের কর্ম এবং উজ্জ্বল ও পথনির্দেশক বাণীর যে মূল্যবান ভাণ্ডার রয়ে গেছে, তার বরকতে আগামী দিনগুলো এই দিনগুলোর চেয়ে বহুগুণ বেশি গৌরবময় হবে। কেননা প্রথম চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের অগ্নিস্তূপ থেকে যে ফিনিক্স জেগে উঠেছিল, তা এখন শত্রুর চাপ এবং বিশেষ করে সাম্প্রতিক দুটি চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের ফলে এত বড় হয়ে উঠেছে যে তার উড্ডয়নের ছায়া শত্রুর ভূখণ্ডের ওপরও পড়েছে।

এই সুযোগে আরবদের বীর আমির এবং প্রতিরোধ ফ্রন্টের মহান প্রতীক, উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন শহীদ জনাব সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহর (আল্লাহ তাঁর পবিত্র আত্মাকে পবিত্রতর করুন) দ্বিতীয় শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে তাঁকে স্মরণ করা অত্যন্ত যথাযথ। তিনি ছিলেন তাঁর জাতি ও তাঁর মতাদর্শের একনিষ্ঠ কল্যাণকামী, যাঁর সত্যনিষ্ঠ ও মাধুর্যপূর্ণ ভাষণ এবং সাহসী পদক্ষেপ তাঁর জনগণের, বরং বিশ্বের স্বাধীনচেতা মানুষদের হৃদয়কে দৃঢ় করত। তিনি সেই ব্যক্তি, যিনি লেবাননের নাম, যা একটি ছোট দেশ এবং বছরের পর বছর কিছু শক্তির পেছনের উঠোনে পরিণত হয়েছিল, মহিমায় উচ্চকিত করেছেন। তিনি সেই ব্যক্তি, সাহায্য ও বিজয় যাঁর চিরসঙ্গী ছিল, এবং নিঃসন্দেহে শামের সমগ্র ইতিহাসে আজ পর্যন্ত নবীগণ ও তাঁদের ওয়াসিগণের পর সেই প্রাচীন ভূখণ্ডে তাঁর মতো মহান কোনো পুরুষের আবির্ভাব ঘটেনি। আর এখন তাঁর গৌরবময় পতাকা জনাব শেখ নাঈম কাসেমের (আল্লাহ তাঁকে হেফাজত করুন) হাতে, যিনি হিজবুল্লাহর সুদৃঢ় ও আশুরাই সারির অগ্রভাগে থেকে সাহসিকতার সঙ্গে তাঁর পথ অব্যাহত রেখেছেন।

লেবাননের এই দিনগুলো ইতিহাসের দরবারে, বরং এখন থেকেই, তাঁর ও প্রতিরোধের সকল মুজাহিদের জন্য উজ্জ্বল ও গৌরবময় দিন, আর তাদের জন্য লাঞ্ছনাকর ও শেষ পর্যন্ত অবমাননাকর দিন, যারা ইহুদিবাদী শত্রুর মোকাবিলায় আধিপত্যবাদী ও তাদের অশুভকামীদের মিথ্যা প্রতিশ্রুতির দিকে আশার দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছে। তারা প্রতিরোধের শহীদ সাইয়্যেদ, সাইয়্যেদ হাশেম সাফিউদ্দিন এবং প্রতিরোধের বর্তমান মুজাহিদদের বিপরীতে, যাঁরা কালের প্রবাহে দীপ্তিমান নক্ষত্রের মতো আলো ছড়াবেন এবং বিভ্রান্তিতে পথ হারানো পথিকদের পথপ্রদর্শক হবেন, খুব শীঘ্রই এবং ইতিহাসের পাতা প্রথমবার উল্টানোর সঙ্গেই সমাধিস্থ ও বিস্মৃত হবে, আর ভবিষ্যতে যখনই তাদের কথা উঠবে, তারা মন্দ, অবিবেচনা এমনকি হয়তো বিশ্বাসঘাতকতার স্মারক হিসেবে গণ্য হবে।

পরিশেষে আশা করি, আল্লাহর অনুগ্রহের ধারাবাহিকতা এবং আমাদের মাওলার (আল্লাহ তাআলা তাঁর মহিমান্বিত আবির্ভাব ত্বরান্বিত করুন, আমাদের প্রাণ তাঁর জন্য উৎসর্গিত হোক) বিশেষ দোয়ায় ইরানি জাতি ও প্রতিরোধের সকল সহযোদ্ধা কেবল সাহায্য, বিজয় ও মর্যাদারই সম্মুখীন হবেন, আর তাঁদের শত্রুরা কেবল পরাজয় ও লাঞ্ছনারই; আল্লাহর অনুগ্রহ ও দয়ায় (بمنِّ‌الله و کرَمه)।

সাইয়্যেদ মোজতবা হোসেইনি খামেনি
৬ মেহের ১৪০৫